ভেঙেই গেল ঐক্যফ্রন্ট?

  • ১৬-জানুয়ারী-২০১৯

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

অন্যতম প্রধান শরিক হলেও বিএনপির প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জরুরি বৈঠক। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে বৈঠক শুরু হয়। ৫টা ৫০ মিনিটে বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে উপস্থিত হননি বিএনপির কোন প্রতিনিধি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ঐক্যফ্রন্ট কী তবে ভেঙেই গেল।

সবার প্রশ্ন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিএনপির কোনো নেতা কেন আসেননি। বৈঠকে শেষে সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্ন উঠলো ঐক্যফ্রন্টের দলগুলোর মধ্যে কোনো মনোমালিন্য আছে কি না? জোটের নেতা আ স ম রব অবশ্য বললেন, ‘ঐক্যফ্রন্টে কোনো মনোমালিন্য নেই।’ অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বললেন বৈঠকের খবরই জানেন না তিনি। তাকে নাকি কেউ জানায়নি বৈঠকের কথা। ফলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের বিচ্ছেদই ঘটছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।

ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেএসডি’র সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ঐক্যফ্রন্টের নেতা সুলতান মোহাম্মাদ মুনসুর, নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ।

বৈঠকে শেষে ঐক্যফ্রন্টের দফতর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু বলেন, বিএনপির কেউ বৈঠকে যোগ দেননি। কেন যোগ দেননি তা বলতে পারবো না। একই প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ। তাই আসতে পারেননি।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটিতে ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ রয়েছেন। ফখরুল অসুস্থ থাকলেও বৈঠকে খন্দকার মোশাররফ ও মওদুদ আহমদ কেন আসেননি এমন প্রশ্ন করলে মন্টু বলেন, ‘তাদের আসার কথা ছিল। কিন্তু মামলা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তারা আসতে পারেননি।’ তবে খন্দকার মোশাররফ বললেন উল্টো কথা। তিনি বলেন, ‘আমি মিটিংয়ের খবর জানি না। আমাকে জানানো হয়নি, এটা আমি বলতে পারি। তাই বলতে পারবো না কিসের মিটিং।’

বৈঠক শেষে আ স ম রব বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। এ নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আন্দোলনে সব মানুষের অংশগ্রহণের অংশ হিসেবে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, অবস্থান কর্মসূচি পালনের কথাও ভাবছে ঐক্যফ্রন্ট। আগামী পরশুদিন ড. কামাল হোসেন চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবেন। তিনি ফিরলে পরবর্তীতে আরও কর্মসূচি দেয়া হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন পরবর্তী সংলাপের আগ্রহের বিষয়ে ঐক্যফ্রন্ট কী ভাবছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক মন্টু বলেন, ‘কোন প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের কথা বলছেন? ৩০ ডিসেম্বরতো কোনো নির্বাচনই হয়নি। আমরাতো নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি।’

জানা গেছে, তবে নির্বাচনে ভরাডুবির পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়তে বিএনপির ভেতরে-বাইরে চাপ বাড়ছে। ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক অলি আহমেদ বলেছেন, জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে জোট করে রাজনৈতকিভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। এদিকে, ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। ভোটের প্রায় দু'সপ্তাহ পর জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেন। পাশাপাশি অপরাধী সংগঠনটির সঙ্গ ছাড়তে বিএনপিকে চাপ দেয়ার কথাও জানান তিনি।

এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপি ও বিশ দলীয় জোটের নেতারা বলেন, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা-না রাখা নিয়ে বাইরের কারও পরামর্শের প্রয়োজন নেই। বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপিকে কি করতে হবে সে জন্য বাইরের কারও উপদেশ গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করি না। ২০ দলীয় জোট থাাকার পর অন্য কোন জোটে যাবার প্রয়োজন ছিল না।

এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের বলেন, আমি তো মনে করি না, তাদের প্রেশার ক্রিয়েট করার মতো কোনো শক্তি আছে। কারণ তাদের দলীয় কোনো অবস্থান নেই। এটা যদি করতে হয় বিএনপিকে করতে হবে। বিএনপি যদি চায় জামায়াতের সঙ্গে থাকবে না, তবেই সেটা সম্ভব।

দুই জোটে থাকা- না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিএনপিকে সময় দেয়া হয়েছে বলে জানান ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। তিনি বলেন, বিএনপিকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুই দিকে সংসার করা ঠিক হবে? নাকি একদিকে এসে অবস্থান পাকা করবে। আমরাও বিএনপিকে সময় দিচ্ছি, বিএনপিও চিন্তা করুক।

যে সমস্ত ব্যক্তিরা কোনো দিন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না, তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে, কতদূর কি করা যাবে সে সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে বলেই মনে করেন অলি আহমেদ। জামায়াত-বিতর্ক, নির্বাচনে ভরাডুবি আর ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ২০ দলে বিশ্লেষণ চলছে বলে জানান কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, এখন কাজ হলো চিন্তা করা, আত্ম-সমালোচনা করা। একটা বিপর্যয় যার জন্য ২০ দলীয় জোট বা বিএনপি মানসিকভাবে হয়ত প্রস্তুত ছিল না।

এবার কৌশলে ভুল করলে বিএনপির সামনে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করেন বিশ দলীয় জোটের শরিকরা। সে কারণেই কি ঐক্যফ্রন্টকে উপেক্ষা করছে বিএনপি? এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে।