তাবলিগের চলমান সংকট নিরসনে যা করণীয়

  • ১৬-জানুয়ারী-২০১৯

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল দেওবন্দ যাচ্ছে। সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর মনিটরিং করছেন। গত ১৫ তারিখ প্রতিনিধি দলের যাওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্য তা পিছিয়ে গেছে। চিন্তাশীল উলামায়ে কেরাম মনে করেন, বাংলাদেশে তাবলিগের চলমান সংকট নিরসনে সরকারি প্রতিনিধি দলের দেওবন্দ যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত প্রসংশনীয় উদ্যোগ। এটি মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ধর্মপরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দাওয়াতে তাবলিগের একটি অরাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার পথে সংঘাত থেকে তিনিই মূলত গোটা জাতিকে বাঁচানোর জন্য শক্ত হাতে সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেন। মাওলানা সাদ সাহেব হেফাজতের আলেমদের দাবি অনুযায়ী আসলেই গোমরাহ বা মুরতাদ হয়ে গিয়েছেন কি না তা স্পষ্ট হলেই সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে।

সরকারি প্রতিনিধি দলের কাছে দেওবন্দ যদি লিখিত আকারে জানিয়ে দেয় যে, তিনি আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতে নেই, গোমরা হয়ে গেছেন, তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা গোটা জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করব। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি লিখিত চিঠিও নেওয়া যেতে পারে দেওবন্দের মুহতামিমের বরাবর- এমন মতামতও দিচ্ছেন অনেক বিচক্ষণ উলামায়ে কেরাম। তাছাড়া প্রতিনিধি দলের সকল সদস্যের সর্বসম্মত স্বাক্ষরে প্রতিবেদন তৈরি হলে বিভ্রান্তি অনেকটা নিরসন হতে পারে বলে কেউ কেউ মত দিচ্ছেন। 

বাংলাদেশে তাবলিগের সংকট নিরসন চান যেসব আলেম তারা মনে করছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের তরফ থেকে একটি লিখিত চিঠি এ বিষয়ে সৃষ্ট অনেক কঠিন জটিলতাকে সহজ করে দিতে পারে। চিঠিতে এতদিন ধরে হেফাজত নেতাদের তাবলিগের নামে ওজাহাতি জোড়ে বলে আসা কথাগুলোই উল্লেখ করে এ বিষয়ে দেওবন্দের মতামত কী তা জানতে চাওয়া যেতে পারে বলে সৃজনশীল আলেম সমাজ মনে করেন। যেমন, তাবলিগের বিশ্ব আমির মাওলানা সাদকে মানতে দেওবন্দের কোনো আপত্তি আছে কি না? পাকিস্তান থেকে তাবলিগ পরিচালনার জন্য যে শূরা গঠন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশে কিছু আলেম বাস্তবায়ন করতে চান তা দেওবন্দ সমর্থন করে কি না? বাংলাদেশের হেফাজত সংশ্লিষ্ট আলেমরা মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে নিয়ে যা বলছেন বা যে আন্দোলন করছেন, তা দারুল উলুম দেওবন্দ বিশ্বাস করে কি-না? হেফাজতে ইসলামের আলেমরা যেমনটি বলে আসছেন যে, মাওলানা সাদ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে বের হয়ে গিয়েছেন! তিনি গোমরা হয়ে গিয়েছেন! তিনি তাবলিগে নতুন ভ্রান্ত মতবাদ চালু করেছেন ইত্যাদি বিষয়ে দেওবন্দ কী ভাবছে তাও জানতে চাইবে এই প্রতিনিধি দল। 

আমরা মনে করি, আরও বেশকিছু বিষয় স্পষ্ট হওয়া উচিৎ। যেমন- বাংলাদেশের ইজতেমায় আসতে দেওবন্দের কোনো বাধা আছে কি না? ভারতে অবস্থিত তাবলিগের বিশ্ব মারকাজ ‘নিজামুদ্দীন মারকাজ’ ও তার জিম্মাদারের তত্ত্বাবধানে তাবলিগের কাজ ও বিশ্ব ইজতেমা আগের মতো পরিচালনায় দেওবন্দের কোনো আপত্তি বা নিষেধাজ্ঞা আছে কি না? দেশের অধিকাংশ বুজুর্গ আলেম সংকট নিরসনে এবার এসব বিষয়ে দেওবন্দের লিখিত মতামত আশা করছেন। যা নিয়ে বাংলাদেশে চরম ধর্মীয় সংঘাত ও মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। 

আমরা মনে করি, বাংলাদেশে এই চলমান সংকট যেসব প্রশ্ন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে, সেসব প্রশ্ন আড়াল করে একবাক্যে হ্যাঁ/না সূলভ কিছু একটা জিজ্ঞাসা করে চলে আসা হবে আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। এতে প্রতারিত হবে আলেম-উলামার ভক্তবৃন্দ সাধারণ মুসলমান। পরবর্তীতে এই লুকায়িত সত্য প্রকাশ হয়ে গেলে স্থায়ীভাবে জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাস হারাবে আলেম সমাজ। এতে জটিলতা আরও সহস্রগুণ বাড়বে। তাই আমরা মনে করি, যদি প্রকৃতপক্ষেই এই প্রতিনিধি দল সংকট নিরসনে আন্তরিক হয়ে থাকে তাহলে, তাদের উচিৎ হবে ৩টি কাজ করা। 

১। আলোচিত প্রতিটি আপত্তি ও প্রশ্ন নিয়ে দেওবন্দে খোলামেলা আলোচনা করা। যেসব বিষয়ে আলোচনা না করলেই নয় তন্মধ্যে রয়েছে, মাওলানা সাদ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে খারিজ (বিচ্যুত), গোমরাহ, ইহুদিদের দালাল, বাতিলের গুপ্তচর, মুরতাদ ইত্যাদি বঙ্গীয় ধর্মালোকের বর্ণিল শব্দকোষের সঙ্গে দেওবন্দ একমত কি না? আরও জানতে হবে, বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতিমায় যেতে দেওবন্দের আপত্তি কোথায়? যদি আপত্তি থাকে তাহলে নিজ দেশ ই-িয়ায় তারা কোটি লোকের ইজতিমাগুলোতে বাধা দিচ্ছে না কেন? আর যদি আপত্তি না থাকে তাহলে, দেওবন্দের নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশে অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের ব্যপারে দেওবন্দের দৃষ্টিভঙ্গি কী?- ইত্যাদি বিষয়গুলো খোলাসা না করা হবে মারাত্মক খেয়ানত। 

২। দেওবন্দের সিদ্ধান্ত তার অফিশিয়াল প্যাডে সুস্পষ্টভাবে লিখিত আকারে নেওয়া। এবং

৩। প্রতিনিধি দলের সকল সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবেদন তৈরি করা। 

এবারও যদি দেওবন্দ থেকে মৌখিক মতামত নিয়ে ফিরে এসে লুকোচুরি খেলা হয় এবং মাওলানা সাদ ও বিশ্ব ইজতেমা-সংক্রান্ত জটিলতার কোনো সমাধানের পথ বের করা না হয় তাহলে সাম্প্রদায়িক সংঘাত আর বাড়বে।

আমরা মনে করি, মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে দেওবন্দ ‘ইতমিনান’ আছে কি না, এটা এক ধরণের ‘আহম্মকী’ প্রশ্ন। অনেকটা ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো ব্যাপার। কোনো জীবিত ব্যাক্তির ওপর ইতমিনানের কোনো সুযোগ নেই। চাই তিনি হারামাইনের ইমাম হোন কিংবা দেওবন্দের মুহতামিম বা শাইখুল হাদিস হোন কিংবা বিশ্ব আমির হোন, কারও ব্যাপারে জীবিত থাকাবস্থায় ‘ইতমিনান’ হওয়া যাবে না। অতএব, ইতমিনানের প্রশ্ন শুধু সাদ সাহেবের ব্যাপারে কেন চাওয়া হবে? হেফাজতের জুমহুর ওজাহাতি আলেমদের ব্যাপারেও-তো ইতমিনানের প্রশ্ন তোলা উচিৎ দেওবন্দের কাছে।